পৃষ্ঠাসমূহ / Pages

প্রসঙ্গ : রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী দেবী

রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কাদম্বরী দেবীর ৫ই জুলাই ১৮৬৮ সালে বিয়ে হয়। তখন  কাদম্বরী দেবীর বয়স ৯ বছর। কাদম্বরী দেবীর আসল নাম ছিল মাতঙ্গিনি গঙ্গোপাধ্যায়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন  বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি তাঁর নানা কর্মকান্ডে জড়িত থাকার ফলে কাদম্বরী তাঁকে খুব একটা কাছে পেতেন না। তিনি কাদম্বরী দেবীকে সঙ্গ দিতে না পারলেও  তিনি তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন।  জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন একজন আধুনিক মনষ্কা ব্যাক্তি। তিনি কাদম্বরী দেবীর শিক্ষার সাথে সাথে তখনকার দিনে খোলা মাঠে তাঁকে ঘোড়ায় চড়া শেখানোর ব্যাবস্থাও করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন যে জ্যোতি দাদা ও বৌঠান  চিৎপুরের রাস্তা দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে গঙ্গার ধারে ইডেন গার্ডেনে বেড়াতে যেতেন।

কাদম্বরী দেবীর বিয়ের সময় রবির বয়স ছিল ৭ বছর ও কাদম্বরীর ৯ বছর অর্থাৎ দুজনে প্রায় সমবয়সী ছিলেন এবং সেই কারনেই কাদম্বরী দেবীর  খেলার সাথী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।  রবীন্দ্রনাথের জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন : "He had been her playmate and companion ever since her marriage."  কাদম্বরী দেবী স্বামীকে খুব একটা কাছে পেতেন না ,  তিনি ছিলেন উপেক্ষিতা এবং একাকি। এমত অবস্থায় রবীন্দ্রনাথই ছিল তাঁর সঙ্গী।
রবীন্দ্রনাথের ২২ বছর বয়সে হটাৎ এবং অপ্রত্যাশিত ভাবেই বিয়ে হয় ১১ বছর বয়সী ভবতারিনি দেবীর সাথে, ৯ই ডিসেম্বর ১৮৮৩ সালে। (In the words of biographer Mukhopadhyay, Tagore's marriage at the end of 1883 had been "sudden and unexpected.") জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন "কারোয়ার হইতে ফিরিয়া আসার কিছুকাল পরে ১২৯০ সালে ২৪ শে  অগ্রহায়ণে আমার বিবাহ হয়, তখন আমার বয়স বাইশ বৎসর।" পরে ভবতারিনি দেবীর নাম বদলে মৃনালিনি রাখা হয়।  তাঁর বিয়ের  চারমাস কয়েকদিন পরে, কাদম্বরী দেবী ১৯ এপ্রিল ১৮৮৪ সালে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার কারন জানা থাকলেও তা প্রকাশ্যে আসেনি। Biographer Mukhopadhyay writes of Kadambari Devi's death: "The reasons are shrouded in mystery. But that there was some family misunderstanding, it cannot be doubted."
কাদম্বরী দেবীর অকালমৃত্যু কবির মনে গভীর শোকের ছায়া রেখে যান। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষাতেই তা চিঠি , গান বা কবিতার মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে পরোক্ষভাবে ব্যক্ত করেছেন। তাই কবির অনেক গানে ও কবিতায় কাদম্বরী দেবীর উপস্তিতি দেখতে পাই। জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন - "কিন্তু আমার ২৪ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিছয় হইল তাহা স্থায়ী পরিছয়। তাহা তাহার পরবর্তী  প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটা ছুটিয়া যায়, কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। তাই সেদিনকার সমস্ত দুঃসহ আঘাত বুক পাতিয়া লইতে হইয়াছিল।" তাঁর একটি চিঠি থেকে বোঝা যায় তাঁর শোক কতটা গভীর ছিল। কবি অমিয় চক্রবর্ত্তীকে (পরবর্ত্তীকালে ইনি কবির সাহিত্য সহায়ক হয়েছিলেন) লিখেছিলেন - " আমি তোমারই বয়সে, তোমার মতো  আমার জীবনেও  এক গভীর শোক নেমে এসেছিলো। আমার এক অতি নিকট আত্মীয়া আত্মহত্যা করেছিলেন। তিনি ছিলেন আমার  জীবনের, সেই বাল্যকাল থেকে, এক সম্পুর্ন অবলম্বন। তাঁর অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে মনে হয়েছিল যেন আমার পায়ের নীচের মাটি সরে গেছে, আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। আমার পৃথিবী শুন্যে পরিনত হয়েছে , আমার জীবনের মধুর স্বাদ জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে।"  বাংলায় অনুবাদ করে এই দাঁড়ায় ।
কবি তাঁর জীবন স্মৃতিতে লিখেছেন -  ছোটবেলায়  মাকে হারানোর  শোক  তিনি ততোটা বুঝতে পারেননি , কারন কাদম্বরী দেবী মায়ের অভাবটা বুঝতে দেন নি। যদিও কাদম্বরী তখন তাঁরই বয়সী এবং খেলার সঙ্গী।
অনেক কবিতা ও গানে তাঁর ছায়া দেখা যায়। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর চার বছর পর কবি  "তবু মনে রেখো -- " গানটি লেখেন। এটা তাঁকে উদ্দেশ্য করেই লেখেন এতে কোন সন্দেহ নেই।  গানটি বুঝতে হলে, গানটি কাদম্বরী দেবীর মুখে বসিয়ে পড়তে বা শুনতে হবে। 


  " তবু    মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে।
যদি    পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।
             যদি   থাকি কাছাকাছি,
দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি ---
                      তবু     মনে রেখো ।।
       যদি জল আসে আঁখিপাতে,
 এক দিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে,
                     তবু     মনে রেখো ।
এক দিন যদি বাধা পড়ে কাজে শারদ প্রাতে - মনে রেখো ।।
                   যদি       পড়িয়া মনে
 ছলোছলো জল নাই দেখা দেয় নয়নকোণে --
                   তবু    মনে রেখো ।। "


সৌজন্যে  youtube "Supe2U" channel


প্রথম শোক (FIRST SORROW)
কবি এই কবিতাটি কাদম্বরির মৃত্যুর ৩০ বছরেরও বেশি পরে লেখেন।

বনের ছায়াতে যে পথটি সে আজ ঘাসে ঢাকা ।
সেই নির্জনে হটাৎ পিছন থেকে কে বলে উঠলো,
" আমাকে চিনতে পার না?"
আমি ফিরে তার মুখের দিকে তাকালেম।
বললেম, " মনে পড়ছে, কিন্তু ঠিক নাম করতে পারছি না।"
সে বললে,  "আমি তোমার সেই অনেক কালের,
সেই পঁচিশ বছর বয়সের শোক।"
তার চোখের কোনে একটু ছল্‌ছলে আভা দেখা দিলে,
যেন দিঘির জলে চাঁদের রেখা।
অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেম ।
বললেম  " সেদিন তোমাকে শ্রাবনের মেঘের মতো কালো দেখেছি,
আজ যে দেখি আশ্বিনের সোনার প্রতিমা।
সেদিনকার সব চোখের জল কি হারিয়ে ফেলেছ।"
কোনো কথাটি না বলে সে একটু হাসলে;
বুঝলেম সবটুকু রয়ে গেছে ওই হাসিতে।
বর্ষার মেঘ শরতে শিউলিফুলের হাসি শিখে নিয়েছে।
আমি জিজ্ঞাসা করলেম," আমার সেই পঁচিশ বছরের যৌবনকে  কি আজও  তোমার কাছে রেখে দিয়েছ ।"
সে বললে - "এই দেখো-না আমার গলার হার। "
দেখলেম, সেদিনকার বসন্তের মালার একটি পাপড়িও খসেনি।
আমি বললেম, " আমার আর তো সব জীর্ণ হয়ে গেল, কিন্তু তোমার গলায় আমার সেই পঁচিশ বছরের যৌবন  আজও ত ম্লান হয়নি।"
আস্তে আস্তে সেই মালাটি নিয়ে সে আমার গলায় পরিয়ে দিলে।
বললে " মনে আছে? সেদিন বলেছিলে তুমি সান্ত্বনা চাও না, তুমি শোককেই চাও।"
লজ্জিত হয়ে বললেম "বলেছিলেম । কিন্তু তারপর অনেকদিন হয়ে গেল, তারপরে কখন ভুলে গেলেম।"
সে বললে "যে অন্তর্যামীর বর, তিনিতো ভোলেননি। আমি সেই অবধি ছায়া-তলে গোপনে বসে আছি। আমাকে বরন করে নাও।"
আমি তার হাতখানি আমার হাতে তুলে নিয়ে বললেম, " একি তোমার অপরূপ মুর্তি। "
সে বললে,  " যা ছিল শোক, আজ তাই হয়েছে শান্তি।"
  <<<<>>>>

সত্যাজিৎ রায়  রবীন্দ্রনাথের "নষ্টনীড়" গল্পটিকে  "চারুলতা" সিনেমায় রূপান্তরিত করার আগে  রীতিমতো Research করেছিলেন বলেই শোনা যায়। এটাই স্বাভাবিক, কারন তিনি সত্যজিৎ রায়। গল্পের চারুলতাই বাস্তবের কাদম্বরী।  Marie Seton, তার লেখা  (1971 )  'Portrait of a Director : Satyajit Ray' বইয়ে লেখেন -  Ray, when he was doing research on Tagore during the later 1950s in preparation for turning "The Fouled Nest" into film, came across, as Seton puts it, "Tagore's marginal notations linking the name of Rabindranath's sister-in-law . . . with that of Charu, the novel's central character." সত্যজিৎ "নষ্টনীড়" পান্ডুলিপির মার্জিনে কাদম্বরী দেবীর Notation  বা  স্কেচ দেখতে পান যা থেকে অনুমান করা  যায় যে গল্পের চারুলতা বাস্তবের কাদম্বরী দেবীরই প্রতিফলন। কবি তাদেরই গল্প লিখেছেন "নষ্টনীড়" উপন্যাসে।

Andrew Robinson, in his 1989 book called 'Satyajit Ray : The Inner Eye', reiterates Seton's finding and elaborates, stating that Ray had seen "a very early manuscript of Nastanirh with marginalia which refer many times to Hecate", Tagore's nickname, we are told, for Kadambari Devi.
"নষ্টনীড়" গল্পটি লেখার সময়ও কবির মাথায় কাদম্বরী দেবী ছিলেন তাইতো পান্ডুলিপির মার্জিনে কখনো দেখা যায়  কাদম্বরীর ডাকনাম "হেকাটি" (গ্রীক দেবতা) কখনো  বা কাদম্বরীর স্কেচ।  তাই কোন সন্দেহ নেই যে  কবি নষ্ঠনীড়ের গল্পের মাধ্যমে কাদম্বরীর কথা, তার স্বামীর কথা এবং নিজের কথাই বলেছেন, তবে অন্য নামে।  "The manuscript Ray saw, moreover, had a sketch of Kadambari Devi in profile, Ray told Robinson. It convinced Ray that Tagore's sister-in-law was on his mind as he wrote his story "The Fouled Nest." 

Marie Seton in her above named book, at one place adds parenthetically that Bengal believed the sister-in-law "committed suicide following 'Rabi's' marriage." লেখিকা Marie Seton এখানে অপ্রাসঙ্গিকভাবে  উল্লেখ করছেন যে সবার বিশ্বাস কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যার কারন রবি'র বিয়ে।
এর কোন প্রমান নেই , তবে সবদিক ভেবে দেখলে আপাতঃ দৃস্টিতে তাই মনে হয় । কারন বাস্তবে হয়তো কাদম্বরী দেবী রবি বিয়ে করুক তা চাননি তাই  তিনি যশোরে রবীন্দ্রনাথের জন্য  উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে পাননি। এই অবস্থায় হটাৎ রবির বিয়ে হয়ে গেল এক ১১ বছরের অশিক্ষিত ভবতারিনী নাম্নী মেয়ের সাথে। বিয়ের চারমাস কয়েকদিন পরেই কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন।
 রবির হটাৎ বিয়ের কারন জানা নেই। যে কারনেই হোক , হটাৎ করেই রবির বিয়ের ব্যবস্থা হয়। কিছু  ঘটনা বা সম্পর্কের সুত্রপাত পরিবারের গুরুজনেরা বুঝতে পারেন এবং তড়িঘড়ি রবির বিয়ের ব্যবস্থা  হয় । কাদম্বরী  মৃনালিনির সাথে রবির বিয়ে হোক তা চান নি । তিনি গোপনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু  কিছু ফল হয়নি । একদিন রবির বিয়ে হয়ে গেল। তাঁর সবচেয়ে কাছের এবং প্রিয়জন হটাৎ এক এগারো বছর  বয়সী মেয়ের হয়ে গেল, এটা  কাদম্বরী কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। এই অবস্থায় কোন উপায়ন্তর না দেখে কাদম্বরী মৃত্যুকেই বরন করে  নিলেন ।


সত্যজিত রায়ের  "চারুলতা"  সিনেমায় অমলের ভুমিকায় সৌমিত্র  ও চারুলতার ভুমিকায় মাধবি। গানটি গেয়েছেন কিশোর কুমার।

সৌজন্যে
http://www.parabaas.com/rabindranath/articles/pClinton1.html
http://en.wikipedia.org/wiki/Jyotirindranath_Tagore
www.youtube.com

৪টি মন্তব্য:

  1. বহুদিন বাদে এত ভালো ব্লগ পড়লাম। আশাকরি আরও নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারবো।

    উত্তরমুছুন
  2. আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
    আপনার ভাললাগা আমার অনুপ্রেরনা।
    নমস্কার।

    উত্তরমুছুন
  3. khub bhalo likhechen...Kadambari Devi sombonde aaro jante parle upokrito hotam...dhonnobad.

    উত্তরমুছুন
  4. আপনার মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন