পৃষ্ঠাসমূহ / Pages

শিল্পনগরী চিত্তরঞ্জন


আমি কলকাতা থেকে দুপুর নাগাদ পৌছালাম। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সামনের বারান্দায় বসে বিশ্রাম করছিলাম। কিন্তু পরক্ষনেই এই শিল্পনগরীর নিঝুম নির্জনতা আমাকে গ্রাস করল এবং সেটাই আমার কাছে উপভোগ্য হয়ে ঊঠল কারন  মহানগরীতে  যা  উপলব্ধি করা যায় না তা এই  ছোট শহরে এসে প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হল। আমের মঞ্জরীর  মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিলাম,  চারিদিক ম ম করছে। মহানগরের যন্ত্রনাদায়ক যান্ত্রিক শব্দে অভ্যস্ত আমার কান ভুলে যাওয়া নানা পাখির কাকলিতে সজাগ হয়ে উঠলো। মনে হল কোন বনবাংলোয় বসে আছি। নির্জন দুপুরে প্রকৃতির এই বিচিত্র  সৌন্দর্য্য  ঊপভোগ করতে লাগলাম। এটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা যা আগে  মহানগরীতে হওয়া দুরের কথা, এই নগরীতেও আগে কখনো হয়নি।  চারিদিকে কংক্রিটের জংগল তৈরী হচ্ছে কিন্তু এই শহরে সেই ধরনের কোন "জংগলায়ন" হচ্ছে না । এখানে সবুজায়ন সফল ভাবে হয়েছে যার ফলে পাখির সংখা বেড়েছে ।
চিত্তরঞ্জন রেল কলোনীর একটি রাস্তা
শিল্পনগরী চিত্তরঞ্জন। এই শহরের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমানায়, আধুনা ঝাড়খন্ডের গা ঘেঁসে।  চিত্তরঞ্জনের পশ্চিমে মিহিজাম । এই ছোট জনপদটির জলবায়ু একদা মধুপুর শিমুলতলার মতোই  স্বাস্থকর  ছিলো এবং স্বাস্থোদ্ধারের জন্য বহু বাঙ্গালী ধনীদের এখানে বাড়ী ছিলো। এই বাড়ীগুলি বিশাল এরিয়া জুড়ে  বাগান ঘেরা হতো।  এই মিহিজাম আরো একটি কারনে বিখ্যাত ছিলো । ডাক্তার পরেশ ব্যানার্জীর দাতব্য চিকিৎসালয় (Homoeo) । এই চিকিৎসালয়ে প্রতিদিন আসে পাসের গ্রাম গঞ্জ থেকে  বহু লোক ঔষুধের জন্য ভীড় করত। সবই ছিল বিনামুল্যে। এই  পান্ডব বর্জিত অঞ্চলে বহুলোক সাপের কামড়ে মারা  যেত। সাপের কামড়ের জন্য ডাঃ পরেশ ব্যানার্জী "লেক্সীন" নামে একটি  ঔষূধ আবিষ্কার করেছিলেন বলে আমার  শোনা।

"B" টাইপ কোয়ার্টার
১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের এই অনুন্নত অঞ্চলে রেল কারখানা  স্থাপিত হয়। বিধান রায়ের মুখ্যমন্ত্রীত্বের আমলে।  দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নামে নামকরন হয় চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানা (CLW) ।  এই কারখানা থেকে প্রথম রেল ইঞ্জিন (STEAM ENGINE) বের হয় ২৬ জানুয়ারী ১৯৫০। গড়ে ওঠে বিশাল এক  পরিকল্পিত শহর। এই শহর গড়তে বহু জমি (অবশ্যই  কৃষিজমি সহ) প্রয়োজন হয়েছিল। জমির জন্য সেদিন  বহু গ্রামকে  স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। আজকের  রাজনীতি  তখন থাকলে এটাকে উচ্ছেদ এবং ভিটেছাড়া বলে বিরোধীতা করে, গ্রামের গরীব গুর্বো সরল মানুষদের নিয়ে রাজনীতি করে এই   কারখানার দফা রফা  করে ছাড়ত। সেদিনও জমির মালিকেরা সবাই যে প্রথমে খুশি ছিল  তা নয়। তবে সেদিন তাদের পাশে কোন রাজনৈতিক পার্টী দাঁড়ায়নি বা ভোটের রাজনীতি করেনি। শিল্পের জন্য সবই হয়েছিল শান্তিপুর্নভাবে ।  বহু বহু লোক চাকুরী পেয়ে এই শিল্প নগরীতে বাস করে উন্নত জীবন যাত্রায় সামিল হতে পেরেছিল এবং  তাদের ছেলেমেয়েরা  আজও এই শিল্পস্থাপনাকে আশীর্বাদ বলেই মনে করে। কারন আজ তারা এক উন্নত শহরে বাস করে , উন্নত জীবন যাপন করতে পারছে। সেইসব  অখ্যাত গ্রামগুলির নামে নাম  হয়েছে  রেল কলোনীর এক একটা অঞ্চলের  এবং  সেইসব হারিয়ে যাওয়া  গ্রামগুলি এই কংক্রিটের জঙ্গলে  চাপা পড়েও  আজো বেঁচে আছে। নামগুলো সুন্দর -  যেমন আমলাদহি, ফতেপুর এবং সিমজুড়ি । এই তিনটি গ্রাম এই শিল্পায়নে  শহিদ হয়ে আজও অমর হয়ে আছে ।

তখন আজকের চিত্তরঞ্জন রেল ষ্টেশনটির নাম ছিল মিহিজাম। চিত্তরঞ্জন শিল্প নগরী স্থাপিত হওয়ার পর,  ষ্টেশনটির নাম পালটে হয় চিত্তরঞ্জন। চিত্তরঞ্জন রেল কারখানা পশ্চিমবঙ্গে এবং মিহিজাম  ষ্টেশনটি ঝাড়খন্ডে, তবুও  চিত্তরঞ্জন রেল কারখানাকে ভারতীয় রেলের মানচিত্রে তুলে আনার জন্য  ষ্টেশনটির নামকরন হয় চিত্তরঞ্জন। তাছাড়া চিত্তরঞ্জন মিহিজামের তুলনায় এক বিশাল জনপদ তাই নামকরন খুবই যুক্তিযুক্ত এবং গ্রহনযোগ্য। অফিসার ও কর্মীদের জন্য প্রায় ৯০০০ কোয়ারটার্স আছে ও মনোরঞ্জনের জন্য দুটি সিনেমা হল- রঞ্জন ও শ্রীমতি ও একটি মুক্তমঞ্চ - "রবীন্দ্রমঞ্চ"  আছে ।  দুটি খেলার মাঠ  আছে  ( ওভাল ও শ্রীলতা) যেখানে নানাধরনের খেলা ধুলা আয়োজিত হয়ে থাকে। এখানে প্রতি পল্লীতে  একটি কম্যুনিটি হল আছে, যেখানে প্রতিবছর দুর্গাপুজা আয়োজন হয়ে থাকে।
 সব কিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই শহরটারও কিছু পরিবর্তন হয়েছে, তবে উল্লেখযোগ্য  কিছু নয়। শহরটা  আগের চেয়ে  অনেক বেশি সবুজ হয়েছে।  সবারই আগের তুলনায় জীবন যাত্রার মান অনেক বেড়েছে। সেই সঙ্গে স্কুটার ও মোটর গাড়ীর সংখা বেড়েছে। আগে সাইকেল ও স্কুটার/ মোটর সাইকেল দেখা যেত।

শহরের প্রতিটি রাস্তাই পিচের এবং  পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। এই শহরে দুট বড় বড় জলাশয় আছে। শীতকালে সেখানে পরিযায়ী পাখির আগমন হতো, এখন হয় কি না জানা নেই। "হিলটপ" (Hill top) চিত্তরঞ্জনের  নিজস্ব  এক হিল ষ্টেশন যেখান থেকে একনজরে শহরটাকে দেখা যায়। তবে সবুজায়নের ফলে এখন আর কিছু দেখা যায় না।  সবুজে সবকিছু ঢাকা পড়ে গেছে।
বহুদিন পর আবার চিত্তরঞ্জন এলাম।  আমার কৈশোর ও যৌবনের কিছুটা সময় কেটেছে এই চিত্তরঞ্জন শিল্প নগরিতে। জন্ম মৃত্যু বিয়ে আর  চাকুরী কার কোথায় লেখা থাকে কেও জানে না। এখানে চাকুরী আমারও হয়েছিল কিন্তু ভালোটা বেছে নেবার জন্য আমাকে চিত্তরঞ্জন ছেড়ে বাইরে যেতে হয়েছিল। কাজেই এই শহরের প্রতি আমার একটা আলাদা মমতা  আছে। তাই এতসব লিখে ফেললাম।


৩টি মন্তব্য:

  1. ভাল লাগল এই পোস্টটা পড়তে।
    আমিও বাংলা তে একটা ব্লগ লেখা শুরু করেছি।
    ইচ্ছা হলে দেখতে পারেনঃ
    আমার ব্লগ

    উত্তরমুছুন
  2. Hi, I have been visiting your blog. ¡Congratulations for your work! I invite you to visit my blog about literature, philosophy and films:
    http://alvarogomezcastro.over-blog.es

    Greetings from Santa Marta, Colombia

    উত্তরমুছুন
  3. Hi, I am glad to know that you are visiting my blog. Thank you very much.
    My blog is in a Indian Language that is called "Bangla" . Do you know the language ? Anyway, keep visiting.
    I will definitely visit your blog. Thank you,
    Regards and greetings from Anil, India

    উত্তরমুছুন